ট্রাম্পের ব্যর্থ অভ্যুত্থান!

 প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:০০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের ব্যর্থ অভ্যুত্থান!


যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাঁচ সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রক্ষণশীল সমর্থকরা পরাজয় স্বীকার করেননি। তারা বরং প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট জো বাইডেনের ওপর ভোট চুরির দায় চাপাচ্ছেন।




শনিবার এই দাবিতে বিক্ষোভও করেছেন ট্রাম্পের দল। অথচ শুক্রবার(১১ ডিসেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মোটামুটি থামিয়েই দিয়েছে বলা যায়। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পরও থামবেন কিনা এর প্রমাণ পাওয়া যাবে সামনের দিনগুলোতে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাজে শুধু মার্কিন গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, ইউরোপের মিত্ররাও আতঙ্কিত। অনেকে ট্রাম্পের এই চেষ্টাকে ‘ক্যু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।



যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ১৪ ডিসেম্বর ইলেকটোরাল কলেজ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচিত করবে। ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ইলেকটোরাল কলেজের ভোটকে অনুমোদন দেবে। কিন্তু গত সপ্তাহে টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। এতে তিনি জর্জিয়া, মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া এবং উইসকনসিনের লাখ লাখ ভোট বাতিলের দাবি জানান, যেগুলো জো বাইডেন পেয়েছেন। মামলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ ১৯টি স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং কংগ্রেসের ১২৭ জন রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থন ছিল।


কিন্তু স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট মামলা খারিজ করার কারণ হিসেবে বলেছে, মামলাটি করার কোনো আইনি সক্ষমতা টেক্সাসের নেই। আদালত বলেছে, যখন অন্য একটি স্টেট তাদের নির্বাচন করে তখন টেক্সাসের সেই নির্বাচনে কোনো বিচারিক আগ্রহ থাকতে পারে না। এই আদেশ ট্রাম্পের জন্য আরো একটা ধাক্কা। কারণ এর আগে তিনি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বলেছিলেন নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। এর আগে পেনসিলভেনিয়াতে জো বাইডেনের জয়ের বিরুদ্ধে করা আরেকটি মামলা খারিজ করেছিল আদালত।


নির্বাচনের পর থেকেই ট্রাম্প এবং তার সমর্থকরা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে কয়েক ডজন মামলা করেছেন। কিন্তু কোনোটিতে জো বাইডেনের জয়কে উলটে দেওয়ার কাছাকাছি আসতে পারেনি। মার্কিন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী বাইডেন ট্রাম্পকে ৩০৬-২৩২ হারিয়ে দেন। বাইডেন দেশব্যাপী ট্রাম্পের চেয়ে ৭০ লাখ ভোট বেশি পান। কিন্তু তার পরও ট্রাম্প জয়ের আশা দেখছেন। তিনি বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে।


প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের ওপর শেষ ভরসা করেছিলেন। তিনি শুক্রবারের আগে মধ্যরাতেও টুইট করে বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি বিজ্ঞতা এবং সাহসের পরিচয় দেয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। মার্কিনিরা ভোটের অধিকার ফিরে পাবেন। এখন ট্রাম্প কেন এতোটা ভরসা করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের ওপর? কারণ সুপ্রিম কোর্টে ৯ জন বিচারপতি আছেন। এর মধ্যে ছয় জনই রক্ষণশীল, যাদের রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টরাই নিয়োগ দিয়েছেন। তিন জনই নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।


তাই তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবেই পরিচিত। নির্বাচনের আগে গত অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অ্যানি কোনি ব্যারেটকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন তড়িঘড়ি করে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হয়। তার পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়োগ বন্ধ করেননি। তিনি বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টেই পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হবে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রিম কোর্ট আসলেই আমাদের হতাশ করেছে। সেখানে প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার বালাই নেই। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মার্কিনিরা প্রতারিত হয়েছেন। আমাদের দেশকে অসম্মানিত করা হয়েছে। আদালতে এ দিনটি চাইনি আমরা। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারের ভূমিকারও সমালোচনা করেন।


লন্ডনভিত্তিক জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের রাজনৈতিক রিপোর্টার জন হেনলি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরাজয় এবং জো বাইডেনের জয়ে খুশি হয়েছিল ইউরোপ। কিন্তু এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আচরণে তারা বিস্মিতই হয়েছেন। ইউরোপীয়রা কোনোভাবেই মার্কিন নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। ব্রেক্সিট, অর্থনৈতিক ধস, সন্ত্রাসী হামলা, সহিংসতা, ফ্রান্সে বিক্ষোভে পুলিশের নিষ্ঠুরতা সবকিছুই ইউরোপের বিষয়। কিন্তু তারা এগুলো নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয়, যতোটা চিন্তিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতার স্থায়ী করার আচরণ নিয়ে।



ব্রাসেলসে বিভিন্ন মিডিয়ার রাজনৈতিক সংবাদদাতা ডেভ কিয়েটিং বলেন, সবাই ভাবছেন তারা এ কী দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রে! ইউরোপীয়রা এখন যুক্তরাষ্ট্রে আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে কিনা তা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করছেন। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতারও আশঙ্কা করছেন। জন হেনলির মতে, ইউরোপসহ আমেরিকার কিছু মিডিয়াও বলছে, ট্রাম্প অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করছেন। যদিও তারা জানেন অভ্যুত্থান ঘটাতে হলে অস্ত্র ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দরকার হয়। এখানে অস্ত্র ও দ্রুত সিদ্ধান্তের বিষয়টি না থাকলেও ট্রাম্পের আচরণ বলছে, তিনি জয় ছিনিয়ে নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটাতে চান। ট্রাম্প সেই কাজটি করতে চেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টকে ব্যবহার করে। সেটিও তার সঙ্গে মানানসই হয়নি।



আন্তর্জাতিক এর আরও খবর: