রমজানে তাহাজ্জুত: ক্ষমা ও কবুলিয়তের গোপন চাবিকাঠি

 প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ন   |   ধর্ম

রমজানে তাহাজ্জুত: ক্ষমা ও কবুলিয়তের গোপন চাবিকাঠি

রবিউল আলম মুন্না :

ইসলাম ধর্মে ইবাদতের বিশেষ কিছু সময় ও মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলোর মর্যাদা অন্য সময়ের তুলনায় অধিক। পবিত্র রমজান মাস তেমনই এক মহিমান্বিত সময়, যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে। এ মাসে ফরজ রোজার পাশাপাশি নফল ইবাদতেরও রয়েছে অতুলনীয় সওয়াব। বিশেষ করে গভীর রাতের ইবাদত—তাহাজ্জুত নামাজ—রমজানে এক ভিন্ন তাৎপর্য লাভ করে। 

রমজানে তাহাজ্জুত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ নফল ইবাদত। রমজান মাসে এর সওয়াব আরও বৃদ্ধি পায়। তাহাজ্জুত হলো রাতের নামাজ, যা ঘুম থেকে উঠে আদায় করা হয়। এটি ফরজ নয়, কিন্তু অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সুন্নত নফল ইবাদত। তাহাজ্জুদ নামাজ ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং মর্যাদাপূর্ণ একটি নফল বা সুন্নত ইবাদত। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাহাজ্জুদের স্থান। নিচে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম, সময় এবং রাকাত সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:  কুরআনে উল্লেখ, আল-কুরআন-এ আল্লাহ বলেন:“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত (ইবাদত)।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৭৯)

তাহাজ্জুত নামাজ কী?: তাহাজ্জুত আরবি শব্দ ‘হুজূদ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ঘুম ত্যাগ করা। অর্থাৎ রাতের ঘুম থেকে জেগে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে নফল নামাজ আদায় করা হয়, সেটিই তাহাজ্জুত। এ নামাজ ইশার পর থেকে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত পড়া যায়, তবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আদায় করাই সর্বোত্তম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুত আদায় কর; এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত (নফল) ইবাদত।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৭৯)

কোরআন নাজিলের মাস ও রাত্রিকালীন ইবাদত:  রমজান মাসের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি এই কারণে যে, এ মাসেই নাজিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। আল-কোরআন মানবজাতির জন্য হেদায়াত, নূর ও জীবনবিধান হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে এ কিতাব। আল্লাহ তাআলা বলেন, “রমজান মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫) রমজানের রাতগুলো বিশেষভাবে বরকতময়। বিশেষ করে শবে কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সূরা আল-কদর-এ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” এই বরকতময় রাতগুলিতে তাহাজ্জুত নামাজ আদায় বান্দাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে।

হাদিসে তাহাজ্জুতের ফজিলত: তাহাজ্জুত নামাজ সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে নিয়মিত তাহাজ্জুত আদায় করতেন। এমনকি তাঁর পা ফুলে যেত দীর্ঘ কিয়ামের কারণে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, “আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?” এক হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, “কে আছে, যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে, যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) রমজানে এই রহমত আরও ব্যাপকভাবে বর্ষিত হয়। কারণ রমজান হলো ক্ষমা ও মুক্তির মাস। 

রমজানে তাহাজ্জুতের বিশেষ তাৎপর্য: রমজানে দিনের বেলায় রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ সংযম ও তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করে। রাতের ইবাদত সেই তাকওয়াকে আরও পরিশুদ্ধ করে। দিনের রোজা দেহকে সংযত করে, আর রাতের তাহাজ্জুত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। রমজানে তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করা হয়। অনেকেই মনে করেন, তারাবি পড়লেই তাহাজ্জুতের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ইসলামী শরিয়তে তাহাজ্জুত একটি পৃথক নফল ইবাদত। তারাবি ইশার পর আদায় করা হয়, আর তাহাজ্জুত মূলত রাতের গভীরে, ঘুম থেকে উঠে আদায় করাই উত্তম।

রমজানে তাহাজ্জুতের ফজিলত:১. দোয়া কবুলের সময় – শেষ রাতে আল্লাহ বান্দার ডাকে সাড়া দেন। ২. গুনাহ মাফ হয় – নিয়মিত তাহাজ্জুত গুনাহ ক্ষমার মাধ্যম। ৩. মর্যাদা বৃদ্ধি পায় – আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। ৪. লাইলাতুল কদর পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি – রমজানের শেষ দশকে বিশেষ গুরুত্ব।

আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম: তাহাজ্জুত এমন একটি ইবাদত, যা সম্পূর্ণরূপে বান্দা ও তার রবের মধ্যকার সম্পর্ককে গভীর করে। রাতের নিস্তব্ধতায়, যখন চারপাশ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন একজন মুমিন আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করে, দোয়া করে—এই দৃশ্য আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। কোরআনে মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:১৭-১৮) রমজানে এই গুণ অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়।

দোয়া কবুলের বিশেষ সময়: ইসলামে কিছু সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাতের শেষ তৃতীয়াংশ তার মধ্যে অন্যতম। রমজানে প্রতিদিনের সেহরির সময়টিও এই পরিসরের অন্তর্ভুক্ত। ফলে সেহরির আগে তাহাজ্জুত আদায় করে দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, যারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—রিজিক, সুস্থতা, সন্তানের কল্যাণ, গুনাহ মাফ, হেদায়াত—এসবের জন্য নিয়মিত তাহাজ্জুত আদায় করে দোয়া করেন, তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেন।

পাপ মোচন ও গুনাহ থেকে মুক্তি: রমজান নিজেই গুনাহ মাফের মাস। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” একইভাবে তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের ইবাদতে দাঁড়ায়, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।” এখানে ‘রাতের ইবাদত’ বলতে তারাবি ও তাহাজ্জুত উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। 

মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি: আধুনিক ব্যস্ত জীবনে মানুষ নানামুখী দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে আক্রান্ত। তাহাজ্জুত নামাজ মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য মাধ্যম। গভীর রাতে একান্তে আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করা হৃদয়কে হালকা করে। অনেক মনোবিজ্ঞানীও বলেন, নীরব ধ্যান ও প্রার্থনা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। ইসলামে তাহাজ্জুত সেই ধ্যান ও প্রার্থনার এক পরিপূর্ণ রূপ।

সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব: যে ব্যক্তি নিয়মিত তাহাজ্জুত আদায় করে, তার চরিত্রে পরিবর্তন আসে। সে গুনাহ থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়। রমজানে এই অনুশীলন পুরো বছরের জন্য একটি ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করে। একটি সমাজে যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ রাতের ইবাদতে অভ্যস্ত হয়, তবে সে সমাজে অন্যায়-অপরাধ কমে আসা স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহভীতি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান সুযোগ: তাহাজ্জুত আদায়ে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। গৃহিণী, কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী কিংবা প্রবীণ—যে কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী রাতের কিছু সময় ইবাদতে ব্যয় করতে পারেন। রমজানে পরিবারের সবাই মিলে সেহরির আগে জেগে তাহাজ্জুত আদায় করলে পারিবারিক বন্ধনও দৃঢ় হয়। রমজান থেকে সারা বছরে: রমজানে যারা তাহাজ্জুতের অভ্যাস গড়ে তোলেন, তারা সারা বছর তা বজায় রাখতে পারেন। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রমজান হলো প্রশিক্ষণের মাস; আর বাকি বছর তার বাস্তবায়নের সময়। রমজানে অর্জিত এই আধ্যাত্মিক শক্তি, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য যদি বছরজুড়ে বহাল রাখা যায়, তবে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে।

* শর্ত: তাহাজ্জুদ নামাজের মূল শর্ত হলো, এশার নামাজের পর রাতের কিছু অংশ ঘুমাতে হবে এবং এরপর ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়তে হবে। (তবে কেউ যদি রাতে না ঘুমান, তবে তিনি শেষ রাতে নামাজ পড়লে তা 'কিয়ামুল লাইল' বা নফল হিসেবে গণ্য হবে এবং তাহাজ্জুদের সওয়াবও পেতে পারেন)।

কিভাবে আদায় করবেন:তাহাজ্জুতের নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা নেই। দুই রাকাত করে যত ইচ্ছা পড়া যায়। সাধারণত ৮ রাকাত বা ১২ রাকাত পড়া হয়। শেষে বিতর নামাজ আদায় করা উত্তম, যদি আগে না পড়ে থাকেন। নিয়মিত আদায়ের জন্য কিছু পরামর্শ: দ্রুত ঘুমানোর অভ্যাস করা, অ্যালার্ম ব্যবহার করা, কম রাকাত দিয়ে শুরু করা, নির্দিষ্ট দোয়ার তালিকা রাখা, ধারাবাহিকতা বজায় রাখা | সর্বনিম্ন ২ রাকাত পড়া যায়। তবে ২ রাকাত করে ৪, ৬, ৮ অথবা ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া উত্তম।  রাসূলুল্লাহ (সা.) সাধারণত ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ এবং ৩ রাকাত বিতরসহ মোট ১১ রাকাত পড়তেন।

তাহাজ্জুদের পর দোয়া : রাতের শেষ ভাগ দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। এই সময়ে আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকেন। তাই নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করবেন এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করবেন।

উপসংহার : পবিত্র রমজান মাস ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। এ মাসে তাহাজ্জুত নামাজ আদায় এক বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল, যা বান্দাকে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেয়। গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় সিজদায় লুটিয়ে পড়া একজন মুমিনের কান্না আল্লাহর দরবারে অমূল্য। রমজান আমাদের সামনে আবারও সেই সুযোগ এনে দেয়—নিজেকে বদলানোর, গুনাহ থেকে ফিরে আসার, এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার। তাই আসুন, এ রমজানে আমরা তাহাজ্জুতের অভ্যাস গড়ে তুলি এবং রাতের অন্ধকারে আলোর সন্ধান করি।

লেখক : রবিউল আলম মুন্না , অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট,  ব্র্যান্ড এন্ড কমিউনিকেশনস ডিপার্টমেন্ট,সাউথইস্ট ব্যাংক পি এল সি.

ধর্ম এর আরও খবর: